বিশ্ব
ব্রিগেড মঞ্চে আব্বাস সিদ্দিকি।
Posted on 25 Mar, 2021

তিনি পা রাখতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল ব্রিগেড মঞ্চ থেকে যেন হুঙ্কার দিলেন আব্বাস সিদ্দিকি। ভাইজান ঢুকতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল ব্রিগেডের জনতা।যেন এলেন, বললেন আর জয় করলেন। সংক্ষিপ্ত অথচ জোরাল বক্তব্যে মঞ্চ কাঁপালেন আব্বাস সিদ্দিকি ।  ব্রিগেডের মঞ্চ থেকেই স্পষ্ট বার্তা দিলেন কংগ্রেসকে। ‘তোষণ নয়, ভাগীদার’ হতে এসেছেন ,   ব্রিগেড মঞ্চ থেকে বলেন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা। এদিন অধীর চৌধুরীর বক্তব্য চলাকালীনই ব্রিগেডে প্রবেশ করেন ভাইজান। সমর্থকদের উল্লাশের জেরে মাঝমধ্যে বক্তব্য থামাতে হয় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিকে। এরপর অভিনেতা বাদশা মৈত্র তাঁর নাম ঘোষণা করতেই করতালিতে ফেটে পড়ে ব্রিগেড। শুরু থেকেই ঝাঁঝালো বক্তৃতা রাখেন আব্বাস সিদ্দিকি। মহম্মদ সেলিম ও বিমান বসুকে 'ভালোবাসার মানুষ' বলে সম্বোধন করে আগাগোড়াই বামেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন পীরজাদা।' আগাগোড়া বক্তব্যেই সংখ্যালঘুদের অধিকারের সুর শোনা যায় আব্বাসের বক্তব্যে।আব্বাসের কথায়, 'এটা রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলা। এখান থেকে BJP-র কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।'

আব্বাস সিদ্দীকী, ঐতিহ্যবাহী ফুরফুরা দরবারের সাহেবজাদা বা পীরজাদা। চট্টগ্রামের মিরস্বরাইয়ের হযরত নুর মুহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.) থেকে কলকাতার ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.) হয়ে ফুরফুরা সিলসিলা। আর ফুরফুরা থেকেই শর্ষিনা ও অন্যান্য দরবার হয়ে পুরো বৃহত্তর বাংলায় ইসলামের আলোর বাতিঘর হচ্ছে এই ফুরফুরা। বংশগতভাবে তাঁরা সিদ্দীক, ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.)-এর বংশের মর্যাদাবান উত্তরাধিকারী।

জনাব আব্বাস সিদ্দীকী সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন, বাংলার পশ্চিম খণ্ডে তথা ভারতের পশ্চিম বঙ্গ নামের প্রদেশের রাজ্য রাজনীতিতে। পীরজাদা হিসেবে তাঁর আসল মর্যাদা ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে, খ্যাতিও একজন ওয়ায়েজ ও ধর্মীয় নেতা হিসেবে। তবে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন পুরোদস্তুর একজন রাজনীতিকের মতো। কথাটা বলার কয়েকটি কারণ। যথা-

(১) তাঁর রাজনীতি ধর্মীয় নয়, ইসলামপন্থি বা ইসলামি কিংবা শরীয়া রাষ্ট্রবাদীও নয়, রাজনীতিতে তাঁর কোনো ধর্মীয় বা ইসলামি কিংবা শরীয়া অ্যাজেন্ডাও নেই। তাঁর রাজনীতিকে মুসলিম জাতীয়তাবাদী, মুসলিম স্বার্থবাদী ও বা মুসলিম কল্যাণকামী বলা যায়।

(২) তাঁর রাজনীতি মুসলিম স্বার্থবাদী হলেও সাম্প্রদায়িক নয়। তাঁর রাজনীতি স্পষ্টত ভারতীয়, অসম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী। তাঁর মূল লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যার অনুপাতে শিক্ষা, চাকরি, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, রাজনীতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস লালনের যে অধিকার মুসলমানদের পাওয়ার কথা সেটি সংরক্ষণ করা। তবে অনুরূপভাবে যেসব সম্প্রদায় পিছিয়ে রয়েছে, শিক্ষা-চাকরি থেকে বঞ্চিত ও সামাজিক মর্যাদায় বৈষম্যের শিকার তাদের পক্ষেও কাজ করবে তাঁর রাজনীতি। এই পরের বিষয়টি তাঁর মূখ্য লক্ষ্য না হলেও সেই দেশীয় রাজনীতির পরিবেশ-প্রেক্ষাপটে একটা কৌশলও হতে পারে। কৌশল হিসেবে সহি তাঁর রাজনীতি সম্পূর্ণই অসম্প্রদায়িক, সেক্যুলার ‍ও ভারতীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই তাঁর রাজনীতিতে ধর্মীয়ভাবে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান; বর্ণগতভাবে ব্রাহ্মণ, ক্ষৈত্রেয়, বৈশ্য, শূদ্র, দলিত, অচ্ছুত; সম্প্রদায়গতভাবে বাঙালি, আদিবাসী, পাহাড়ি ও লিঙ্গ হিসেবে নর-নারী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাগত হয়েছে। দলের নেতৃত্বে অলংকৃত হয়েছে, সংসদে প্রার্থী হয়েছে।

(৩) ধর্মপ্রচার, তাকওয়া শিক্ষা, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন বা শরীয়তের মাসআলা বর্ণনা এসব রাজনীতির কাজ নয়। রাজনীতির মূল কাজ হচ্ছে, দেশ পরিচালনা, নেতৃত্বদান, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ইনসাফ ও উন্নয়ন। অত্যন্ত মজার বিষয় হচ্ছে, আব্বাস সিদ্দীকীর রাজনীতিও সম্পূর্ণ এই ধাঁচের। তাঁর ও তাঁর দলীয় নেতাদের বক্তব্য সূত্রে জানতে পারছি যে, তিনি একটি হাসপাতাল পরিচালনা করছেন এবং ইতোমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি মুসলিম ও পিছিয়ে জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত হয়ে আইপিএস অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী হতে উৎসাহিত করছেন এবং তাদের জন্য শিক্ষা স্কলারশিপও দিচ্ছেন। তাঁর রাজনীতিতে আগমনের কারণও হচ্ছে এসব কাজ করতে গিয়ে, মাঠ পর্যায়ে নিপীড়িত হওয়া জন-অভিজ্ঞতা ও সামাজিক-রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম-দলিতশ্রেণির সীমাহীন বৈষম্যের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে। স্বাভাবিকভাবেই এসব ব্যাপারই তাঁর রাজনীতির মওযুয়ে পরিণত হয়েছে। যা একটি রাজনীতিক বা রাজনীতিক দলের মূল কাজ।

(৪) রাজনীতি হচ্ছে মূলত জাগতিক বিষয়, মুআমালাতের অন্তর্ভুক্ত কাজ। রাজনীতির সম্পর্ক আসলে বাস্তবতার সাথে, আবেগের সাথে নয়। রাজনীতিতে ধর্ম অনুসৃত হতে পারে, তবে ব্যবহৃত হতে পারে না। প্রথমেই বলেছি, আব্বাস সিদ্দীকীর রাজনীতি কোনো ধর্মীয় রাজনীতি নয়, শরীয়তপন্থিও নয়, ইসলামিও নয়। কাজেই বামপন্থিদের সাথে জোটগঠন, অমুত্তাকি-দাড়িছাড়া ও ফাসিকদেরকে দলে গ্রহণ, নারী নেতৃত্ব, নারীর সাথে সহাবস্থান এবং হিন্দু-মুসলিম সম্প্রতি এসব তাঁর রাজনীতিতে মোটেও দোষণীয় নয়। যদি তিনি এসবকে দোষণীয় মনে করতেন, যদি তাঁর দলটি কোনো মোল্লাতান্ত্রিক দল হতো, হাবাগোবাগোছের ধর্মীয় দল হতো, যদি তাঁর রাজনীতি ইবাদতের রাজনীতি হতো তাহলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর পিলে চমকানো যে উত্থান সেটি সম্ভব হতো না। অবশ্য তিনি একজন ভালো মুসলিম, ধর্মীয় নেতা, ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম উত্তমভাবে অনুসরণ করেন। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতায় তাঁর প্রাধান্য কী হবে? তাঁর প্রাধান্য হবে পর্যায়ক্রমে (এক.) মুসলমানদের শক্তিশালী করা শিক্ষায়-চাকরি ও রাজনীতিক ক্ষমতায়, (দুই.) ক্ষমতার অংশীদার হয়ে মুসলমানদের স্বার্থসংরক্ষণ ও (তিন.) যদি সুযোগ হয় ইসলামের আলোকে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে অবদান রাখা। নাকি উলটো করা!? প্রথমেই শরীয়ত নাকি? সেটা হলে তাঁর বর্তমান রাজনীতিক উত্থান হতো না মোটেই।

(৫) আব্বাস সিদ্দীকীর বক্তব্য, বক্তব্যের বিষয়, বক্তব্যের সময় তাঁর নেতৃত্ববাচক অঙ্গভঙ্গি ও শারীরিক গঠন তাঁকে অসাধারণ দেখায়। কথার স্টাইল, হাত নাড়ানো, অভিভাধন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মার্জিত কথা বলা, কাজের কথা বলা, মানুষের ভাষায় কথা বলা, দেশের আইন ও সংবিধান সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, উত্তেজিত হয়ে খেই হারিয়ে না ফেলা ও নিজের ওজনের চেয়ে বেশি কথা না বলা ইত্যাদি গুণ তাঁকে একজন সত্যিকার নেতায় পরিণত করেছে। তাঁর আরেকটি গুণ যেটি খুব আকর্ষণীয় সেটি হচ্ছে, রাজনীতির ময়দানে তাঁকে অতিপাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য দিতে দেখি না, আবার কোন কথাটি বললে পুরো মাঠকে নিজেরে দিকে আকৃষ্ট করে নেওয়া যায় সেই কৌশলও তাঁর ভালো জানা।

বলেছি, তিনি রাজনীতিতে এসেছেন একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিকের মতো। এই পাঁচটি কারণে তাঁকে একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিক মনে হয় আমার। তাঁর সাথে ও তাঁর রাজনীতির সাথে এখানেই বড় পার্থক্যটা বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা রাজনীতিক বা রাজনীতিবিদের চেয়ে ধর্মীয় নেতা বা ধর্মীয় রাজনীতিক বেশি। তাঁরা রাজনীতিতে এসে জনস্বার্থের চেয়ে ফতওয়াবাদিতা করে বেশি। ধর্মকে অনুসরণের চেয়ে ধর্মকে ব্যবহার করে বেশি। সভায় রাজনীতিক বক্তব্যের চেয়ে ধর্মীয় পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করে বেশি। মোকাবেল হিসেবে আওয়ামী-বিএনপিকে নেওয়ার চেয়ে অন্তর্ধর্মীয় ফেকরা-মাযহাব-মাসলকের মোকাবেলাই এই রাজনীতির বড় প্রচেষ্টা হয়ে থাকে।

#আব্বাস সিদ্দীকী কি বিজেপির বিটিম?

অনেকেই মনে করেন, আব্বাস সিদ্দীকী হিন্দুত্ববাদী ভারতী জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর বিটিম। হায়দরাবাদের আসাদউদ্দীন ওয়াইসীকে একসময় বিজেপির বিটিম মনে করা হতো এবং আসামের মাওলানা বদরুদ্দীন আজমলকেও তাই মনে করা হয়েছে সম্প্রতিকাল পর্যন্ত। বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতেও চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগের বিটিম হিসেবে প্রচার করে জামায়াত জোটের সমর্থকরা। যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, শুধুই অনুমান ও ধারণানির্ভর। তবে এর কোনো সম্ভাবনা নেই ব্যাপারটা তেমনও নয়। রাজনীতিতে রাজনীতিক সমঝোতা, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বা কেউ কারো হয়ে কাজ করার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।

ব্যাপারটা প্রমাণিতসাপেক্ষ নয়, কারণ এই ধরনের সম্পর্ক কেউ স্বীকার করে না এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও এ ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয় না। এমন হওয়া প্রয়োজন নয় যে, নরেন্দ্র মোদীর সাথে আব্বাস সিদ্দীকীর সরাসরি সম্পর্ক আছে, বিজেপির কোনো ডেলিগেটের সাথে তাঁর বৈঠক হয়েছে বা বস্তাভরে তাঁকে টাকা দিয়েছে। এমনও তো হতে পারে যে, বিজেপি তার কোনো মানুষ যে আবার আব্বাস সিদ্দীকীর বিশ্বস্ত তাকে ব্যবহার করে আব্বাস সিদ্দীকীকে রাজনীতিতে আগমনে প্রলুব্ধ করিয়েছে, ব্যাপারটাকে যৌক্তিক ও যুক্তিসম্মতভাবে তাঁর কাছে উপস্থাপন করেছে এবং তাতে তারা সফলও হয়েছে। এমনভাবে সফল হয়েছে যে সফলতার জন্য বিজেপিকে একটা টাকাও খরচ করতে হয়নি!? হতে পারে অসম্ভব নয়।

তবে কি আব্বাস সিদ্দীকীদের রাজনীতিতে আসা উচিত নয়? এক্ষেত্রে ভারতীয় স্বতন্ত্র মুসলিম রাজনীতিক কেরালার মুসলিম লীগ, হাইদরাবাদের ইত্তিহাদুল মুসলিমীন, আসামের ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ও পশ্চিমবঙ্গের সেক্যুলার ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের যুক্তি হচ্ছে, বিজেপির উত্থানের ভয় দেখিয়ে গান্ধী-লালু-পাওয়ার-যাদব-মায়াবতি-বাম-মমতারা শুধু ভোট হাসিল করেছে, মুসলমানদের কোনো উন্নয়ন করেনি, শুধুই ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছে। বস্তুত এই যুক্তিতে দম তো আছে, কারণ বিজেপির উত্থান হয়েছে সম্প্রতি। তার আগে প্রায় ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ভারত শাসন করেছে কংগ্রেস। তখন তাদের চেহেরা কেমন ছিল, বর্তমান বিজেপির চেয়ে কোন অংশে কম খারাপ ছিল? আজ যা বিজেপি ধর্মের নামে করছে ঠিক তাই কংগ্রেস করেছে সাধুবেশে। আজকে ধর্মের ধ্বজাধারী বিজেপির উত্থান হয়েছে বলেই কংগ্রেস লিবারেল হয়েছে। নতুবা মুসলিম ইস্যুতে বিজেপির বর্তমান নেতাদের যে ভূমিকা ঠিক তাই ছিল কংগ্রেসের সেই সময়কার নেতাদের ভূমিকা।

রুশ-ভারত বিরোধী শ্লোগান হতো রাজপথে, সেটা কোন ভারত? কংগ্রেসের ভারত নয়? ১৯৮৭ সালে ভারতবিভক্তি ও স্বাধীনতার পর সীমান্তজুড়ে লাখো মুসলমানদের গণহত্যা করা হয়, দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়, কারা করেছিল? হায়দরাবাদ নিজামশাহী স্টেট কংগ্রেস সরকার দখল করেনি? জুনাগড় মুসলিম রাজ্যটি জবর দখল করেনি কংগ্রেস সরকার? কাশ্মীরে কংগ্রেস সরকারই তো আগ্রাসন চালিয়ে সেটি দখল করে এবং মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালায়। ভারতে মুসলিম সংখ্যা ২০ কোটিরও ওপর, শতকরা সেটি ২০-২৫ হবে। কিন্তু চাকরি, শিক্ষা ও প্রশাসনে মুসলিমরা মাত্র ৩ পার্সেন্টও নয়। মুসলমানদেরকে এভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছিল কংগ্রেসই। অতএব কারণে মুসলিম রাজনীতিবিদদের মতে, কংগ্রেসের কাঝে বিজেপি হচ্ছে একটা প্রবঞ্চনা, ফোবিয়া ও ভীতিসৃষ্টির অস্ত্র। না হয় কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কাজেই মুসলিমদের রাজনীতিতে আসা উচিত এবং স্বতন্ত্র রাজনীতিক শক্তি গড়ে তুলতে প্রয়াসী হওয়া উচিত। যদি নিম্রে দুটো অবস্থার তৈরি হয়। যথা-

এক. যদি অবিজেপি দলের পরাজয় নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যায় কিংবা কোনোভাবেই তাদের পরাজয় টেকানো সম্ভব নয় বলে মনে হয় সেই সময়। যে সময় মুসলিম ভোটব্যাংকও কোনো কাজে না আসে এবং মুসলিম ভোট বিজেপি-অবিজেপিতে বণ্টিত হয়ে যায়, এমন অবস্থায় মুসলিম ইস্যুতে মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে সংসদে নিজস্ব আসন দখলের চেষ্টা-কৌশল কোনোভাবে মন্দ হতে পারে না। দেখা যাচ্ছে কেরালায় মুসলিম লীগ, হায়দরাবাদে ইত্তিহাদুল মুসলিমীন ও আসামে ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট মাত্র এই তিনটি দল তিন প্রদেশে মুসলিম পরিচয়ে সক্রিয় ছিল। অথচ দীর্ঘদিন রাজ করা কংগ্রেস ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে পুরো ভারত থেকে। বস্তুত জয় কারো স্থায়ী হয় না, কোনো না কোনো সময় অবশ্যই পরাজিত হতে হয়। আর যাদের জয়-জোয়ার আসে তাদের জয় সাময়িকভাবে কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু একসময় তারা বিজয়ী হয়ই হয়। তিনটি রাজ্যে মাত্র মুসলিম দল সক্রিয়, তাহলে অন্যান্য রাজ্যে কংগ্রেসের পরাজয় কিংবা এক চতুর্থাংশের কম সিট পাওয়ার জন্য কি মুসলিমরাই দায়ী? এই ভোটব্যাংক রাজনীতি মুসলমানদেরকে যেমন কিছু দেয়নি, তেমনি কংগ্রেসের পরাজয়ও ঠেকানো যায়নি। এজন্য মুসলিম রাজনীতিকদের কৌশল হচ্ছে, মুসলিম ইস্যুতে মুসলিম ভোট ঐক্যবদ্ধ করে সংসদের তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পশ্চিমবঙ্গে সেই কাজটিই করছেন আব্বাস সিদ্দীকী।

দুই. আর্থিক সামর্থ্য থাকা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদা থাকা। বলা হচ্ছে, হায়দরাবাদের মুসলিম রাজনীতিক ব্যারিস্টার আসাদউদ্দীন ওয়াইসীর সম্পদের পরিমাণ ৫ হাজার কোটির উপরে। আসামের মাওলানা বদরুদ্দীন আজমল কাসেমীও অনুরূপ সম্পদের মালিক। তাঁরা বেশ কয়েকটি হাসপাতাল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও দাতব্য সংস্থা পরিচালনা করেন। ওয়াইসী কোথাও প্রার্থী দাঁড় করালে তাঁর সামাজিক অবদান, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও নির্বাচনে টাকা খরচের সামর্থ্য দেখেন। নিজেও প্রার্থীকে মোটা অঙ্গে ডোনেশন দিয়ে থাকেন। যেটি প্রার্থীপ্রতি নূন্যতম ১ কোটির উপর। পশ্চিমবঙ্গের আব্বাস সিদ্দীকীর সাথে এখানে ওয়াইসী ও আজমল সাহেবের বড় ব্যবধান। এখানে বরং আব্বাস সিদ্দীকীর সাথে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদেরই বেশি মিল। আব্বাস সিদ্দীকী যে কয়েকত্রিশ প্রার্থী দিয়েছেন তার বড় অংশই মোল্লা-মুনশি ও ইমাম সাহেব। না আছে অর্থ, না আছে প্রভাব-প্রতিপত্তি। তাঁদের একজন প্রার্থীও জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

#ভাইজান কি দিদির যাত্রাভঙ্গ করবে!?

না, করবে না, পারবে না। তার দুটো কারণ। যথা- (১) ভাইজান শক্ত প্রার্থী দিতে পারেননি, (২) দিদির জনপ্রিয়তায়ও সেভাবে ধস নামেনি।

তবে কি ভাইজান দিদির ক্ষতির কারণ হবে না? তাও হবে না। তাও দুটো কারণে। যথা-

(১) বিজেপি-টিএমসির মোকাবেলায় ভাইজানের প্রার্থী শক্তিশালী নয়, এ অবস্থায় তাকে ভোট দিলে ভোটটি নিশ্চিত নষ্ট হবে বিবেচনায় মুসলমানরা ঠিকই টিএমসিকেই ভোট দেবে।

(২) ভারতীয় মুসলমানরা খুবই সচেতন, তারা তাদের ভালো-মন্দ যথেষ্ট বুঝে।

বাংলাদেশের কিছু শিক্ষিত মানুষের অতিপণ্ডিতি গণিত হচ্ছে, বাংলাদেশে বিগত নির্বাচনে যেভাবে চরমোনাইয়ের পীর সাহেব আওয়ামী লীগের পথ সুগম করেছেন আব্বাস সিদ্দীকীও তাই করছেন পশ্চিমবঙ্গে। প্রশ্ন হচ্ছে কোন নির্বাচন? ২০১৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনকে তো নির্বাচনই বলা চলে না। ২০১৪ সালে তো ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনেই অংশ গ্রহণ করেনি। তাহলে কোন নির্বাচন? ২০০৮ সালের নির্বাচন? বস্তুত এমন একটি আসনও নেই যেটিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর কারণে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। চ্যালেঞ্জের সাথে বলতে পারি যে, এমন একটি আসনও পাওয়া যাবে না যেখানকার হাতপাখা ও ধানের শীষের ভোট একত্রিত করলে বিএনপি বিজয়ী হয়। একে তো ব্যবধানের বিশালতা, অন্যদিকে হাতপাখার ভোট অপ্রতুলতা। একইভাবে ভাইজান টিএমসির কোনো ভোট কাটবে না, বরং খুবই কম ভোটই প্রাপ্ত হবে। কাজেই ভাইজানের জন্য দিদির যাত্রাভঙ্গ হবে না, যাত্রাভঙ্গ হলে স্বাভাবিক নিয়মেই হবে। যেমনটা বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের বেলায় হয়েছে। আল্লাহর পরিবর্তন নিয়মের অনুসারে হয়ে থাকে।